জোঁক দিয়ে আবার কেমন চিকিৎসা?
প্রশ্নটা আসলে যৌক্তিক। অনেকের মনে এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু যেহেতু এই পদ্ধতিটি প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেহেতু এর পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ অবশ্যই রয়েছে।
আসলে জোঁকেরও নানা প্রজাতি রয়েছে। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র একটি প্রজাতিকে চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম হিরুডো মেডিসিনালিস (Hirudo medicinalis)। এই নাম থেকেই বোঝা যায় যে, এর সাথে মেডিসিনের যোগসূত্র রয়েছে। প্রথমে এই জোঁক দিয়ে কেবল শরীরের দূষিত রক্ত পরিষ্কার করা হতো। দেহের অভ্যন্তরে শিরায় পুঁজ সৃষ্টি হয়ে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে, জোঁক ব্যবহার করে উক্ত স্থানে রক্তের প্রবাহ শিথিল করা হতো। কিন্তু এখন হৃদরোগসহ অন্যান্য নানা রোগের চিকিৎসায় জোঁক ব্যবহার করা হয়।
হিরুডো মেডিসিনালিস নামক জোঁকের দুই সারিতে ছোট ছোট দাঁত বিশিষ্ট তিনটি চোয়াল রয়েছে। এই দাঁতগুলো চিকিৎসারত ব্যক্তির চামড়ায় আঁকড়ে ধরে রক্ত শোষণ করতে থাকে। নিজে রক্ত নেওয়ার প্রতিদানস্বরূপ এরা ঠিকই কিছু উপকারি উপাদান রোগীর দেহে দান করে যায়। প্রথমেই এদের দেহ হতে নির্গত হয় একধরনের অ্যানেসথেটিক তরল। এটি জোঁকের কামড়ে ধরা জায়গাটি অবশ করে ফেলে। এর কারণেই আমরা বর্ষা-বাদলের সময় পায়ে জোঁক ধরলে টের পাই না। এছাড়াও জোঁকের লালা থেকে হিরুডিন নামক একটি এনজাইম রোগীর দেহে প্রবেশ করে। অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট সমৃদ্ধ এই এনজাইম রক্ত বিশুদ্ধিকরণ ও অন্যান্য নানা রোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি জোঁক সর্বোচ্চ ১৫ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত শোষণ করতে পারে। শরীরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশ কয়েকটি জোঁক স্থাপন করা হয়। এরা যাতে কামড় দিয়ে আঁকড়ে ধরা স্থান পরিবর্তন না করে, সেজন্য এদের গ্লাস চাপা দিয়ে রাখারও নমুনা রয়েছে। এভাবে একটি থেরাপি চলতে সাধারণত ২০-৪৫ মিনিট সময় লাগে। রোগের ধরন অনুযায়ী এই থেরাপির বিভিন্ন সেশন বা সময়কাল রয়েছে। কামড়ে ধরা স্থান থেকে জোঁকগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর ইংরেজি ওয়াই ( Y ) অক্ষরের মতো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়। এই দাগ সময়ের সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে যায়। চামড়ায় কোনো স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয় না।
বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা হলো, এর পেছনে খরচ তুলনামূলক কম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
যেসব রোগের চিকিৎসায় লিচ থেরাপি ব্যবহার করা হয়
জোঁক যেহেতু রক্ত শোষণ করে, সেহেতু বিভিন্ন রক্তপ্রবাহজনিত রোগের চিকিৎসায় লিচ থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। তাছাড়া জোঁকের লালায় বিভিন্ন উপকারী রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। এগুলো অন্যান্য নানা রোগের চিকিৎসাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হৃদরোগ, কসমেটিক সার্জারি, দন্ত চিকিৎসা, ডায়াবেটিস।
লিচ থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। তবে বিপদের আশঙ্কা পুরোপুরি ব্যক্তি নির্ভর। এই ধরুন, কারো যদি জোঁকের লালারসে অ্যালার্জি থাকে, তবে তার উপর লিচ থেরাপি প্রয়োগ করা উচিত নয়। অনেক সময় ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই যে জোঁকগুলো ব্যবহার করা হবে, তা যাতে চিকিৎসক কর্তৃক অনুমোদিত হয়, সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
লিচ থেরাপি একেবারে শতভাগ প্রাকৃতিক এবং স্বল্পখরচের একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই কোনোদিন এই থেরাপির সম্মুখীন হলে ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। দেখতে উদ্ভট মনে হলেও এই থেরাপির উপকারিতা অনেক এবং খরচও তুলনামূলক কম।
© Rakib Hasan Oasie
Thanks for reading: লিচ থেরাপি: প্রাচীন এক অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতি! , Stay tune to get latest Blogging Tips.
